যেভাবে জনপ্রিয়তার শীর্ষে ভারতীয় খাবার

বিশ্বে জনপ্রিয়তার বিচারে শীর্ষ চারে রয়েছে ভারতীয় খাবার। বাইরের জগতে একে বলা হয় ‘ইন্ডিয়ান কুইজিন’। মুঘল রান্নাঘর থেকে শুরু করে এ খাবার ছড়িয়ে গিয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে। ভারতীয় খাবারের অগ্রযাত্রার কথা লিখেছেন জুবায়ের আহাম্মেদ

বৈশিষ্ট্য

বেশিরভাগ মানুষের বিশ্বাস ভারতীয় খাবারের মূল বৈশিষ্ট্য প্রচুর উপাদানের সমাবেশ। কিন্তু এটা আসলে মূল বিষয় না। অনেক প্রকার রান্না কেবলমাত্র প্রোটিন উৎস (মাছ, মাংস) কিংবা সবজির ওপর নির্ভর করেও রান্না করা হয়। ভারতীয় রান্নার মূল বৈশিষ্ট্য বলা যেতে পারে প্রচুর পরিমাণে মসলার ব্যবহার। এর কারণেই মূলত ভারতীয় রান্নায় ঝাল, ঘ্রাণ ও স্বাদের তারতম্য ঘটে। মসলার গুণে যে জিনিসটি সবচেয়ে বড় হয়ে ওঠে তা হলো খাবারের ঘ্রাণ। বিশ্বের অন্যান্য সব রান্নায় মসলা ব্যবহারের বিভিন্ন রকমফের থাকলেও ভারতীয় রান্নায় মূলত বাটা মসলার ব্যবহারই হয় বেশি। বাটা মসলার গুণেই এই রান্নায় আসে আলাদা এক স্বাদ, যা এখন পর্যন্ত অজস্র মানুষের মন জয় করে নিয়েছে। এলাচ, দারচিনির মতো উপাদানের নিয়মিত ব্যবহার স্বাস্থ্যগত দিক থেকেও ভারতীয় রান্নার মান ধরে রেখেছে। এ কারণেই ভারতীয় রান্না কেবল স্বাদ দিয়েই না, স্বাস্থ্য সচেতনতার দিক থেকেও সারা বিশ্বের ভোজনরসিক মানুষের মন জয় করে নিয়েছে।

বৈচিত্র্য

ভারতীয় রান্নার বড় একটি দিক হলো এর বৈচিত্র্য। যার যেমন দরকার, তেমন রান্না এখানে পাওয়া সম্ভব। মেক্সিকান রান্না মানেই যেমন ঝালের আধিক্য, মার্কিন খাবার যেমন প্রোটিনে ভরপুর, ভারতীয় উপহাদেশের রান্না তেমন একপেশে না। বরং এতে অনেক কিছুই একসঙ্গে পাওয়া সম্ভব। বলা হয়, একটি সাধারণ ভারতীয় রান্নায় ৭টি আলাদা আলাদা উপাদান ব্যবহার করা হয়ে থাকে। মসলার এতরকম ব্যবহার থাকলেও সব উপাদানের স্বাদ আলাদাভাবে বোঝা সম্ভব এই রান্নায়। ভারতীয় রান্নার এই ব্যাপক বৈচিত্র্যের মূল কারণ অবশ্য ভারতীয় উপমহাদেশের আয়তন। বাংলাদেশ থেকে শুরু করে পাকিস্তান পর্যন্ত বিস্তৃত এর নানা রকমফের। তবে শুধু ভারতের কথাও যদি বিবেচনায় আনা হয়, তবে তাতেও বৈচিত্র্য অনেক বেশি আকারে ধরা পড়বে। ভারতের প্রতিটি রাজ্যে আলাদা আলাদা খাবারের প্রচলন রয়েছে। একইরকম খাবারের রন্ধন প্রণালীতেও আছে নানা পার্থক্য। আরও স্পষ্ট করে বললে, কেবল ভারতেই ৩১ ধরনের আলাদা রান্না পাওয়া যায়। বেশ কিছু পরিসংখ্যান মতে, গড়পড়তা হিসেবে ভারতে ২০০০ রকমের আলাদা আলাদা রান্না সম্ভব। বিপুল বৈচিত্র্যের কারণে বিশ্বের প্রায় সব প্রান্তেই ভারতীয় রান্নার আলাদা কদর রয়েছে।

স্বাদ

ভারতীয় উপমহাদেশের রান্নায় সাধারণত ছয় ধরনের স্বাদের সন্নিবেশ দেখা যায়। টক, মিষ্টি, নোনতা, তেতো, ঝাল ও গন্ধযুক্ত। একইসঙ্গে এত ধরনের স্বাদের মিলন আর কোনো খাবারেই খুব একটা চোখে পড়ে না। এ কারণে খুব সহজেই বিভিন্ন অঞ্চলের নিজস্ব খাবারের পাশে ভারতীয় রান্না জায়গা করে নিতে সক্ষম হয়েছে। প্রবাসী ভারতীয় হোক কিংবা ভারতে বেড়াতে আসা পর্যটক, সবাই একসঙ্গে বাহারি স্বাদের এইসব খাবারকে নিয়ে গিয়েছেন এক অঞ্চল থেকে অন্য এক অঞ্চলে। বিভিন্ন প্রকার স্বাদ থাকলেও এইসব রান্নায় কোনো স্বাদ খুব বেশি প্রভাব বিস্তার করে না। বরং সব ধরনের স্বাদ সমানভাবে পুরো রান্নায় বিরাজ করে।

ভারতীয় রান্নায় যেসব উপাদান খুব বেশি ব্যবহার করা হয়, সেগুলোর মধ্যে অন্যতম দারুচিনি, মটরশুঁটি, কাঁচা মরিচ, গোল মরিচ, গরম মসলা, রসুন, জিরা, এলাচ দানা, পেঁয়াজ, ধনিয়া, নারকেল দুধ, আদা, সরিষা দানা ও হলুদগুঁড়া। কিন্তু এতসব কড়া স্বাদের উপাদান ব্যবহার করা হলেও একটি উপাদানের স্বাদ কখনোই আরেকটি উপাদানের স্বাদ নষ্ট করে না, বরং কিছুক্ষেত্রে মিশ্র এক ঘ্রাণ ও স্বাদ তৈরি করে, যা ভারতের নিজস্বতা প্রকাশ করে।

ভারতের রান্নায় এত বিপুল পরিমাণ মসলা ব্যবহার অবশ্য আশ্চর্যজনক কিছুই না। বিশ্বে যত মসলা উৎপাদিত হয় তার ৭০ শতাংশই আসে ভারত থেকে। একক দেশ হিসেবে এরচেয়ে বেশি মসলা আর কোনো দেশে চাষ করা হয় না। এক কথায় ভারত ‘ল্যান্ড অফ স্পাইসেস’ নামেই অনেক বেশি পরিচিত।

স্বাস্থ্যমান

যদিও বর্তমানে ভোজ্যতেলের আধিক্যের কারণে বাংলাদেশসহ ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষের হৃদরোগসহ বিভিন্ন জটিল ব্যাধির দেখা মিলছে, কিন্তু সত্যিকার অর্থে ভারতীয় রান্না এর স্বাস্থ্যমান বিবেচনায় সারা বিশ্বে ব্যাপক সমাদৃত। আদা, রসুন, হলুদ, সরিষা দানার মতো বিভিন্ন উপাদান শরীরের জন্য বেশ উপকারী বলে প্রমাণিত। এসব উপাদানের কারণে পরিপাক যেমন ভালো হয়, একইভাবে দেহের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাও অনেক বেশি থাকে। আর বহির্বিশ্বে যারা স্বাস্থ্যমান অক্ষুণœ রেখে খাওয়া-দাওয়া করতে চান, তাদের প্রত্যেকেই ভারতীয় রান্নাকে নিজেদের পছন্দের শীর্ষে রেখেছেন।
আমিষ ও নিরামিষ রান্নার ক্ষেত্রেও বেশ এগিয়ে রয়েছে ইন্ডিয়ান কুইজিন। এ কথা সত্য, গবাদিপশুর লালন-পালন এবং আমিষের ব্যবহার, সেই সঙ্গে তেল ও চর্বি জাতীয় খাবার ভারতের রান্নার একটি উল্লেখযোগ্য দিক। কিন্তু যারা স্বাস্থ্য সচেতন হয়ে নিরামিষ ভোজনে আগ্রহী, তাদের জন্যও ভারতীয় রান্না একেবারেই আদর্শ। পাশ্চাত্যে নিরামিষ মানেই একেবারেই স্বাদবিহীন এবং কেবল সালাদ নির্ভর খাবারের যে ধারণা, তা ভারতীয় রান্নার ক্ষেত্রে এসে বদলে যেতে বাধ্য। নিরামিষ রান্নার ক্ষেত্রে ‘ইন্ডিয়ান কুইজিন’ অনেক বেশি আলাদা। খিচুড়ি কিংবা সবজি বিরিয়ানির মতো বৈচিত্র্যপূর্ণ রান্নাকে এক্ষেত্রে জনপ্রিয়তার বড় কারণ হিসেবে ধরা যায়।

স্বাস্থ্যমান বিবেচনায় আরেকটি দিক বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ভারতীয় রান্নায় যেকোনো ধরনের প্রিজারভেটিভের ব্যবহার নেই বললেই চলে। কুকিং ওয়াইনসহ যেকোনো বাড়তি স্বাদবৃদ্ধিকারকের ব্যবহার এক্ষেত্রে করা হয় না। সম্পূর্ণ মসলা ও প্রাকৃতিক উপাদানের ওপর নির্ভর করার কারণে স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের পছন্দের তালিকায় ভারতীয় রান্নার স্থান অনেক ওপরে।

ইতিহাস

বিশ্বজুড়ে ভারতীয় রান্না ছড়িয়ে পড়ার পেছনে স্বাদ, মসলার কারসাজি, স্বাস্থ্যমানসহ যত আলোচনাই আসুক, সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে বলা চলে এর ঔপনিবেশিক শাসনের ইতিহাসকে। ইতিহাসের একেবারে সূচনালগ্নে যে কয়েকটি সভ্যতা বিস্তৃত হয়েছিল তার মধ্যে সিন্ধু সভ্যতা অন্যতম। সেই সময় থেকেই বাণিজ্য আর বাইরের বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে ভারত অনেকটাই এগিয়ে ছিল। কলকাতা, কালিকট বন্দরে নিয়মিত আসত বাণিজ্য বহর। ভারতের মসলার বাইরের বিশ্বে যাওয়া-আসা শুরু হয় এসব বন্দরভিত্তিক বাণিজ্যের মাধ্যমে। বিশেষ করে, আরবের বিভিন্ন দেশে খুব দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ে ভারতের মসলার চাহিদা।

আরব বণিকরা এই একই জিনিস চড়া দামে চালিয়ে দিত ইউরোপের বিভিন্ন স্থানে। দীর্ঘদিনের এই বাণিজ্যের পর ইউরোপীয়রা নিজেরাই এই দেশে আসে বাণিজ্যের সূত্র ধরে। স্থায়ীভাবে বাস করতে শুরু করে পর্তুগাল, নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স, ইংল্যান্ডের বিভিন্ন নাবিক থেকে শুরু করে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও। মূলত ভারতীয় রান্নার প্রথম বৈশ্বিক যাত্রার শুরুটা তাদের হাত ধরেই হয়।

ইংল্যান্ড সে সময় বিশ্বের সবচেয়ে বড় ঔপনিবেশিক শক্তি। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে তাদের পদচারণা ছিল। ভারতীয় রান্নার অসাধারণ স্বাদ ইংল্যান্ড হয়ে এবার ছড়িয়ে যেতে থাকে অন্যান্য সব দেশেও। প্রথমদিকে কেবল মসলার ব্যবহার দিয়ে এই যাত্রা শুরু হলেও একে একে ভারতের নিজস্ব রান্নাও সে তালিকায় যুক্ত হয়। উত্তর আমেরিকার দেশগুলোতেও ভারতের রান্না প্রথম পৌঁছে দেয় ইংরেজরাই। তবে স্বাধীনতার পর থেকে ভারতের মানুষ নিজেরাই বিভিন্ন দেশে প্রবাস জীবন শুরু করলে সেই ধারায় আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। বাকি কাজটা ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষরা নিজেরাই করে নিয়েছে।

মুঘল রান্নাঘর

‘পড়েছি মুঘলের হাতে, খানা খেতে হবে সাথে’ প্রবাদের এক লাইনেই বোঝা যায়, ভোজনরসিক হিসেবে মুঘলরা ঠিক কেমন ছিল। মুঘলদের রান্না এতটাই বিখ্যাত ছিল যে তাদের নিয়ে এখনো রীতিমতো গবেষণা করা হয়। পারস্য আর আফগানের মিশ্র এই গোষ্ঠী উপমহাদেশ শাসন করে দীর্ঘদিন জুড়ে। বাদশা বাবর, হুমায়ুন, আকবর, শাহজাহানরা কেবল সাম্রাজ্য বিস্তার, রাজনীতি আর রাষ্ট্র পরিচালনা করেননি। তারা ভারতবর্ষকে রীতিমতো একটি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে এসেছিলেন। যার একটি বড় অংশ জুড়েই ছিল ভোজন রসিকতা। আজকালকার দিনে ব্যাপক জনপ্রিয় বিরিয়ানির প্রচলনটাও শুরু হয়েছিল এই মুঘল সাম্রাজ্যের হাত ধরে।

বাইরের বিশ্বে ভারতীয় রান্না যতখানি ব্যাপক দাপটের সঙ্গে রাজত্ব করছে, বলতে গেলে তার সবটাই মুঘল রাজবংশের করে দেওয়া। মুঘল রান্নায় মসলার ব্যবহার, বিভিন্ন উপাদানের অনুপাত সবই গতানুগতিক রান্নার চেয়ে একেবারেই আলাদা। এক্ষেত্রে অবশ্য আফগানদের কিছুটা কৃতিত্ব দেওয়া যেতে পারে। বিভিন্ন পর্যায়ে আফগান রান্নার কলাকৌশল মুঘল রান্নায় ব্যবহার করা হয়েছিল। যার ফলাফল হিসেবে সৃষ্টি হয় একেবারেই ভিন্ন রকমের এক স্বাদ। শত শত বছর ধরে যা মুগ্ধ করে চলেছে বিভিন্ন রুচির মানুষদের।

রন্ধনপ্রণালী

চোখের দেখায় অনেকেরই মনে হতে পারে, ভারতের যে কোনো রান্না অনেক বেশি কষ্টসাধ্য। তবে বাস্তব চিত্রটা এর পুরোপুরি উল্টো। কেবলমাত্র সহজে রান্না করা যায় বলে সারা বিশ্বে ব্যাপক আকারে ভারতীয় রান্নার সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে। এই অঞ্চলের রান্নায় একইসঙ্গে অনেক ধরনের স্বাদ পাওয়া যায় বলে খুব বেশি পদের আয়োজন করা হয় না। একবিংশ শতাব্দীর কর্মব্যস্ত সমাজে যা অনেক সময়ের অপচয় রোধ করতে সক্ষম। সাধারণ এক রান্নার বই কিংবা টিভি প্রোগ্রাম দেখেই যে কেউই রান্না করতে পারেন।

ইন্ডিয়ান কুইজিনের একেকটি পদেই যে পুষ্টিমান নিশ্চিত হয় সেটি অন্যান্য ফাস্টফুড নির্ভর কুইজিন থেকে অনেক বেশি উন্নত বলা চলে। ফলাফল হিসেবে ভারতীয় রান্নায় অনেক বেশি পদ পরিবেশনে সক্ষম হলেও প্রায়শই এক থেকে দুই পদেই ভোজন পর্ব শেষ করা হয়। আর উচ্চ পুষ্টিমান দেয় ক্ষুধা নিবারণের নিশ্চয়তা।

ভারতীয় রান্না কেবল ক্ষুধা মেটানোর উপলক্ষই না। এই অঞ্চলের সাহিত্য সাধনা থেকে অতিথি অ্যাপায়নসহ ঐতিহ্যের সবটা জুড়ে আছে নানা পদের খাবার। এখানে খাবার মানে রীতিমতো উৎসবের সমান। চৈত্রসংক্রান্তি, মকর সংক্রান্তি, মুসলমানদের ঈদ, হিন্দু সম্প্রদায়ের পূজা সবখানেই উৎসব এখানে খাবারের পাশাপাশি হাত ধরে আসে। খাবারের প্রতি তাই এই অঞ্চলের মানুষের ভালোবাসা আর আবেগ দুই-ই অনেক বেশি। ভালোবাসার সেই বার্তা জয়নুল আবেদিন স্কেচবুকে ধারণ করে রেস্টুরেন্ট বাজিমাত করেছিলেন। নর্থ ডাকোটায় হুমায়ূন আহমেদ অশ্রু ঝরিয়েছিলেন। ফাস্টফুডের বাহারে ভারত, বাংলাদেশ আজ ছেয়ে গেলেও স্বস্তির সবটুকু মিশে থাকে নিজস্ব সেই হলুদ, মরিচ, গরম মসলা কিংবা অন্যান্য বাটা মসলার স্বাদে। একদিন যে খাবার দিয়ে মুঘল সম্রাট আর নবাবরা ব্রিটিশদের স্বাগত জানিয়েছিল, একশ বছরের কম সময়ের মধ্যে সেই খাবার এখন সারা বিশ্বকে বুঁদ করে রেখেছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here