গুজব ও অনুমানের পরিণতি

অপবাদ দেওয়া ইসলামে যেমন নিষিদ্ধ, তেমনি সামাজিকভাবেও কাজটি ঘৃণিত। অপবাদের কারণে মানুষের মান-মর্যাদা নষ্ট হয়। লজ্জিত হতে হয় পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের। তারপরও সমাজে সামান্য স্বার্থ হাসিলের জন্য, নিজের উপকারের জন্য, পদ-পদবি লাভের জন্য অপবাদ দিয়ে অন্যকে হেনস্তা করার ঘটনা প্রায়ই ঘটে। স্রেফ অনুমানের ভিত্তিতে মানুষকে অপমান-অপদস্থ করার ঘটনাও সমাজে ঘটে। তবু এ চর্চা ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। গল্প-গুজব, আড্ডা সর্বত্রই যেন অন্যের দোষচর্চা। চলছে অন্যের দুর্নাম, সমালোচনা ও মিথ্যা অপবাদ দেওয়া।

সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো, আড্ডায় মজার ছলেও অনেকে এমন জঘন্য কাজ করছেন। যারা শুনছেন তারাও কিছু বলেন না। উল্টো বক্তার সঙ্গে তাল মেলান। একজনের কাছ থেকে শুনে কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই ছাড়া ঘটনা ছড়িয়ে দিচ্ছেন অন্যদের মধ্যে।

অথচ শোনা কথা যাচাই-বাছাই ছাড়া বিশ্বাস করা, তা প্রচার করা পাপের কাজ; মিথ্যাবাদী হওয়ার কারণ। মিথ্যা অনেক বড় গুনাহ। মিথ্যার ভয়াবহতা প্রসঙ্গে হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, (একবার) হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের প্রশ্ন করেন, ‘(তোমরা কি জানো) সবচেয়ে বড় গুনাহ কি, আমি কি তোমাদের জানাব না? সাহাবিরা বললেন, হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসুল (সা.)। তিনি বললেন, আল্লাহর সঙ্গে শরিক করা ও বাবা-মাকে কষ্ট দেওয়া। তিনি হেলান দিয়ে এ কথাগুলো বলছিলেন। এরপর সোজা হয়ে বসে বললেন, সাবধান এবং মিথ্যা কথা।’ (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)

কারও নামে অপবাদ রটানো, অন্যের নামে মিথ্যা দোষারোপ মারাত্মক পাপের কাজ। ইসলামে কারও সম্মানহানির অধিকার অন্যের নেই। এগুলো ঘৃণিত ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আল্লাহতায়ালা অপবাদ রটনাকারীর শাস্তি প্রসঙ্গে ইরশাদ করেন, ‘যারা সতী-সাধ্বী নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে অতঃপর স্বপক্ষে চারজন পুরুষ সাক্ষী উপস্থিত করে না, তাদের আশিটি বেত্রাঘাত করবে এবং কখনো তাদের সাক্ষ্য কবুল করবে না। এরাই না-ফরমান।’ (সুরা নুর : ৪)

মিথ্যা অপবাদ দেওয়া ব্যক্তির বিষয়ে কোরআনে কারিমে আরও ইরশাদ হয়েছে, ‘যারা মিথ্যা অপবাদ রটনা করেছে, তারা তোমাদেরই একটি দল। তোমরা একে নিজেদের জন্য খারাপ মনে করো না; বরং এটা তোমাদের জন্য মঙ্গলজনক। তাদের প্রত্যেকের জন্য ততটুকু আছে, যতটুকু সে গুনাহ করেছে এবং তাদের মধ্যে যে এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছে, তার জন্য রয়েছে বিরাট শাস্তি।’ (সুরা নুর : ১১)

কোরআনে কারিমের অন্যত্র আরও ইরশাদ হচ্ছে, ‘যারা বিনা অপরাধে মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদের কষ্ট দেয়, তারা মিথ্যা অপবাদ ও প্রকাশ্য পাপের বোঝা বহন করে।’ (সুরা আহজাব : ৮৫)

কোনো মানুষকে অন্যায়ভাবে ছোট কিংবা ইজ্জতহানির বিষয়ে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) হাদিসে ইরশাদ করেন, ‘কোনো মুসলমান অপর কোনো মুসলমানকে যদি এমন স্থানে লাঞ্ছিত করে যেখানে তার মানহানি ঘটে এবং সর্বদা খাটো করা হয়, আল্লাহ তাকে এমন স্থানে লাঞ্ছিত করবেন, যেখানে তার সাহায্যপ্রাপ্তির আশা ছিল।’ (সুনানে আবু দাউদ)

ইসলামের শিক্ষা হলো, কাউকে অন্যায়ভাবে দোষারোপ করা ও দুর্নাম তো পরের কথা কারও সম্পর্কে প্রমাণ ছাড়া কোনো কথা বলা যাবে না। কান কথায় বিশ্বাস করা যাবে না। সব ধরনের অনুমান থেকে দূরে থাকতে হবে। অথচ এ বিষয়গুলোই এখন সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। ব্যক্তিগত আলাপচারিতা থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও আলাপ-আলোচনা কোনো কিছুই বাদ থাকছে না।

কোনো কিছু শুনে যাচাই-বাছাই ছাড়া সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়ার কারণ সামাজিক বিশৃঙ্খলা, মারামারি এমনকি হত্যাকা-ের মতো নির্মম ঘটনাও ঘটছে। ভিত্তিহীন কথা ছড়িয়ে পড়ায় সমাজে উত্তেজনা সৃষ্টি হচ্ছে, নানা ধরনের গুজবের জন্ম দিচ্ছে। এর সবই ভয়াবহ পাপের কাজ। হাদিসে নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘মুমিনদের প্রতি তোমরা ভালো ধারণা পোষণ করবে। অনুমান করেও কিছু বলা যাবে না। কারণ আল্লাহ বলেছেন, হে মুমিনরা! তোমরা অধিকাংশ অনুমান থেকে দূরে থাকো। কারণ অনুমান কোনো কোনো ক্ষেত্রে পাপ।’ (সুরা আল হুজরাত : ১২)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here